ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে যাওয়া সম্ভব: মুশতাক

মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ইনডোরে হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) দলের একঝাঁক স্পিনারকে নিয়ে নিবিড় অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন জাতীয় দলের স্পিন বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদ। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) অনুশীলন শেষে স্পিনারদের প্রস্তুতি, টেকনিক ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী এই সাবেক লেগ স্পিনার।
স্পিনারদের উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব দিচ্ছেন মুশতাক। অনুশীলনে তিনটি ক্যামেরার মাধ্যমে সামনে, পেছন ও পাশ থেকে বোলিং অ্যাকশন রেকর্ড করা হচ্ছে। পরে সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে টেকনিক্যাল ত্রুটি ও উন্নতির জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে।
মুশতাক বলেন, ‘আমি মনে করি, বিসিবি ও হাই পারফরম্যান্স দলের পক্ষ থেকে এটি দারুণ একটি উদ্যোগ। তিনটি ক্যামেরার মাধ্যমে আমরা সব স্পিনারের বোলিং অ্যাকশন রেকর্ড করছি। এতে তাদের অ্যাকশন নিয়ে বিস্তারিত কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। একটি রিপিটেবল অ্যাকশন থাকলে চাপের মধ্যেও ধারাবাহিকভাবে ভালো ওভার করা সহজ হয়।’
শুধু খেলোয়াড় নয়, স্থানীয় কোচদের দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে এই ক্যাম্প। মুশতাকের মতে, স্পিন বোলিংয়ের মৌলিক বিষয়গুলো সঠিকভাবে জানা থাকলে ভবিষ্যতে খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়াও আরও কার্যকর হবে।
‘আমরা এখানে একদম মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি। একই সঙ্গে স্থানীয় কোচদেরও উন্নয়নের চেষ্টা চলছে, যাতে তারা স্পিন বিভাগ ও পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হয়, সেটি ভালোভাবে বুঝতে পারেন। গত তিন দিনে আসা সব স্পিনারের অ্যাকশন, টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিক্যাল দিক পর্যবেক্ষণ করেছি,’ বলেন মুশতাক।
স্পিনারদের অ্যাকশন নিয়ে শুরুতেই কাজ করার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি। তাঁর মতে, অ্যাকশন যত বেশি পুনরাবৃত্তিযোগ্য হবে, ভিন্ন কন্ডিশনেও বোলারদের নিয়ন্ত্রণ তত বাড়বে।
মুশতাক বলেন, ‘শুরুর দিকেই যদি আমরা তাদের অ্যাকশন ঠিকভাবে সামলাতে পারি, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এটি নিয়ে বেশি চিন্তা করতে হবে না। অনেক সময় পিচে বেশি টার্ন থাকলে বোলাররা শুধু অ্যাকশনের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু ফ্ল্যাট পিচে বোলিং করতে হলে ভালো বায়োমেকানিক্স, সঠিক ব্যালান্স ও কার্যকর অ্যাকশন প্রয়োজন। একটি রিপিটেবল অ্যাকশন ভালো ওভার করতে সাহায্য করে।’
বাংলাদেশের স্পিনারদের পাইপলাইন নিয়েও সন্তুষ্ট মুশতাক। ভবিষ্যতে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে নিয়মিত বিরতিতে এমন ক্যাম্প আয়োজনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর পরিকল্পনা, প্রায় তিন মাস পরপর স্পিনারদের নিয়ে এমন কর্মসূচি আয়োজন করা।
‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশে স্পিনারদের যে কাঠামো ও পাইপলাইন আছে, তা নিয়ে আমরা খুবই আনন্দিত। এ ধরনের ক্যাম্প নিয়মিত হওয়া উচিত। প্রতি তিন মাস পরপর এটি করা গেলে শুধু স্পিনাররাই নয়, স্থানীয় স্পিন বোলিং কোচরাও উপকৃত হবেন। বর্তমানে চার-পাঁচজন স্থানীয় কোচ আমার সঙ্গে কাজ করছেন। তারাও শিখছেন কীভাবে স্পিন বোলিংয়ের ভিত্তি, অ্যালাইনমেন্ট, টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিক্যাল বিষয় নিয়ে কাজ করে ভালো স্পিনার তৈরি করা যায়,’ বলেন মুশতাক।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক জয়ও মুশতাকের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। তাঁর মতে, ‘যখন আপনি নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শুরু করবেন, তখন অস্ট্রেলিয়াকে অস্ট্রেলিয়ায়, ইংল্যান্ডকে ইংল্যান্ডে কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকাকে তাদের মাটিতে হারানো সম্ভব। পাকিস্তানে আমরা দুটি টেস্ট খেলেছিলাম গ্রিন-টপ পিচে। সেটিও ছিল দারুণ একটি উদাহরণ। এরপর পাকিস্তান বাংলাদেশে এলে আমরা টার্নিং পিচে না খেলে গ্রিন-টপ উইকেটেও খেলেছি। আমাদের স্পিনাররা সেখানেও বল ঘুরিয়েছে। তাই এখন তারা হারার ভয় পায় না।’
চলমান ২০২৫-২৭ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে বাংলাদেশের অবস্থানও লড়াইয়ের মধ্যে রয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া পয়েন্ট টেবিল অনুযায়ী ছয় ম্যাচে তিন জয়, দুই হার ও এক ড্রয়ে ৪০ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশের পয়েন্ট শতাংশ ৫৫.৫৬। সামনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে চারটি টেস্ট রয়েছে, ফলে ফাইনালের লড়াইয়ে থাকতে হলে প্রতিটি সিরিজই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মুশতাকের আত্মবিশ্বাসী উত্তর, ‘ইনশাআল্লাহ, কেন নয়? আমরা এখন খুব ভালো অবস্থানে আছি। এভাবে ভালো ক্রিকেট খেলে যেতে পারলে এবং বিশ্বাস ধরে রাখতে পারলে ইনশাআল্লাহ আমরা অনেক দূর যেতে পারব।’
বাংলাদেশের ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরেই অলরাউন্ডার হিসেবে বড় ভূমিকা রেখেছেন সাকিব আল হাসান। তাঁর মতো একজন স্পিন বোলিং অলরাউন্ডারের বিকল্প তৈরি করা নিয়েও কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন মুশতাক, ‘এমন কিছু তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে, যাদের আমরা তৈরি করছি। কিছুদিন আগে নির্বাচক ও কোচদের সঙ্গে একজন বাঁহাতি স্পিনার খোঁজার বিষয়ে কথা বলেছি, যে ভালো ব্যাটিংও করতে পারে।’
তবে প্রতিভা বিকশিত হতে সময় লাগে, মুশতাকের কথায় সেই বাস্তবতাও উঠে এসেছে, ‘আমি সবসময় বলি, একদিনে কোনো গাছ বড় হয়ে ফল দেয় না। আমাদের এখন ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারে এমন রানা আছে, ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করতে পারে এমন আরও কয়েকজন পেসার রয়েছে। এখন আমাদের মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করতে পারে এমন একজন বাঁহাতি স্পিনার দরকার। আশা করি নির্বাচক ও সংশ্লিষ্টরা সঠিক খেলোয়াড়টি খুঁজে বের করতে পারবেন এবং খুব শিগগিরই আমরা তেমন কাউকে পাব।’